Thursday, January 30, 2014

"আমীন মনে মনে বলা"

জামাতে নামায পড়ার সময় ইমাম সূরা ফাতিহা সমাপ্ত করার পর মুকতাদী ‘আমীন’ বলবে। আমীন আস্তে বলা ও জোরে বলা দুটোই শরীয়তের দলীল দ্বারা প্রমাণিত। যদিও অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেয়ীর আমল আস্তে বলাই ছিল, তাই অনেক ফকীহ আস্তে বলাকেই উত্তম বলেছেন। কিন্তু এর অর্থ কোনোভাবেই মনে মনে বলা নয়। ‘আস্তে বলা’ কিংবা ‘অনুচ্চস্বরে’ বলা আর মনে মনে বলা এক কথা নয়।
আমীন বলার ফযীলতপূর্ণ সুন্নতটি আদায় করার সময়ও তা স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করা উচিত।
উদাহরণস্বরূপ এই তিনটি আমলের কথা বলা হল, অন্যথায় তাকবীর, তাসবীহ, তাশাহহুদ ও দুআর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল পরিলক্ষিত হয়। অথচ এই আমলগুলিও মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে আদায় করতে হয়। 
অতএব উদাসীনতা বা অবহেলার কারণে হোক কিংবা না-জানার কারণে, সর্বাবস্থায় উল্লেখিত সকল ক্ষেত্রে মনে মনে বলার ভুল পদ্ধতি সংশোধনযোগ্য।

তাকবীরে তাহরীমা মনে মনে বলা

ইমামের পিছনে নামায পড়ার সময় এই ভুলটি ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে বাঁধাকেই অনেকে যথেষ্ট মনে করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, নামাযের শুরুতে তিনটি কাজ করতে হয়। প্রথমে মনে মনে কোন নামায পড়ছি-এর সংকল্প করতে হবে। এর নাম নিয়ত, যা নামায সহীহ হওয়ার জন্য জরুরি। উল্লেখ্য, মনে মনে সংকল্প করে নিলেই নিয়ত হয়ে যাবে, মুখে উচ্চারণ করতে হবে না।
দ্বিতীয় কাজটি হল, তাকবীরে তাহরীমা। অর্থাৎ স্পষ্ট উচ্চারণে ‘আল্লাহু আকবার’ বলা। যেহেতু এই তাকবীরের মাধ্যমে নামায বহির্ভূত সকল কাজ হারাম হয়ে যায় তাই একে ‘তাকবীরে তাহরীমা’ বলে। এই তাকবীর বলা ফরয। যা স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করতে হবে।
তৃতীয় কাজ হল, কান পর্যন্ত দুই হাত উঠিয়ে ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরে নাভির নিচে বাঁধা। এই কাজটি সুন্নত।
প্রচলিত পরিভাষায় ‘নামাযের নিয়ত বাঁধা’ এই তিন আমলের সমষ্টিকেই বোঝায়।
এখন কেউ যদি শুধু হাত উঠিয়ে তা বেঁধে নিল কিন্তু আল্লাহু আকবার বলল না বা মনে মনে বলল তাহলে নামাযের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবটিই আদায় হয়নি। ফলে তার নামায আদায় হবে না।
অতএব এখানেও তাকবীর স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করা অপরিহার্য। শুধু মনে মনে বলা যথেষ্ট নয়।

নামাযে কয়েকটি ভুল

নামাযে মনে মনে কুরআন পড়া


যে সমস্ত নামাযে আস্তে কেরাত পড়া হয়, সে সকল নামাযে অনেককে দেখা যায়, মুখ-ঠোঁট না নেড়ে মনে মনে সূরা কেরাত পড়েন। হয়তো তারা এই ভুল ধারণা করে আছেন যে, আস্তে আস্তে কেরাত পড়া মানে মনে মনে পড়া।
এটি ঠিক নয়। কারণ যে সকল নামাযে কেরাত আস্তে পড়তে বলা হয়েছে, তার অর্থ হল, নিচু স্বরে তিলাওয়াত করা। আর এতো খুবই সহজ কথা যে, মনে মনে পড়া কোনোক্রমেই নিচু স্বরে পড়া নয়।
ফিকহ-ফাতাওয়ার কিতাবাদি থেকেও বোঝা যায় যে, আস্তে কেরাত পড়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি হল এমনভাবে পড়া, যেন সে নিজে শুনতে পায়। আর সর্বনিম্ন এতটুকু তো অবশ্যই জরুরি যে, সহীহ-শুদ্ধভাবে হরফ উচ্চারণ করা হবে এবং ঠোঁট-জিহবার নড়াচড়া  দেখা যাবে। একটি হাদীসে আছে যে, যোহর ও আসর নামাযে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরআন পড়তেন, তখন কোনো কোনো আয়াত সাহাবায়ে কেরামও কখনো কখনো শুনতে পেতেন। হযরত আবু মামার বলেন, আমরা হযরত খাববাব রা.কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি যোহর ও আসর নামাযে কুরআন পড়তেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমরা প্রশ্ন করলাম, আপনারা কীভাবে বুঝতেন? তিনি বললেন, ‘বিজতিরাবি লিহয়াতিহী’-তাঁর দাঁড়ি মোবারক নড়াচড়া দ্বারা। (সহীহ বুখারী-ফাতহুল বারী ২/২৮৪-২৮৭)
অতএব কেরাত পড়ার সময় জিহবা ও ঠোঁট ব্যবহার করে মাখরাজ থেকে সহীহ-শুদ্ধভাবে হরফ উচ্চারণ করতে হবে। অন্যথায় শুধু মনে মনে পড়ার দ্বারা কেরাত আদায় হবে না।

Friday, April 26, 2013

মক্কা-মদীনার বাইরে সাহাবীদের কবর

বিদায় হজ্বে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবী হজ্ব করেছেন। কিন্তু মক্কা-মদীনা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে অল্প কিছু সংখ্যক সাহাবীরই কবর খুঁজে পাওয়া যায়। বহু সাহাবীর কবর ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। কিছু দৃষ্টান্ত :
হযরত উকবা ইবনে নাফে রা.-এর কবর আলজিরিয়ায়।
হযরত আবুল বাকা আনসারী রা.-এর কবর তিউনিসে।
হযরত রুয়াইফা আনসারী রা.-এর কবর লিবিয়ায়।
হযরত আবদুর রহমান রা.-এর কবর উত্তর আফ্রিকায়
হযরত মা’বাদ ইবনে আব্বাস রা.-এর কবর উত্তর আফ্রিকায়।
হযরত বারা ইবনে মালেক রা.-এর কবর তাসতাবে।
হযরত নোমান আলমুযানী রা.-এর কবর নেহাওয়ান্দে।
হযরত আবু রাফে রা.-এর কবর খোরাসানে।
হযরত আবদুর রহমান ইবনে সামুরা রাহ.-এর কবর খোরাসানে।
হযরত আবু আইউব আনসারী রা.-এর কবর ইস্তাম্বুলে।
হযরত আবু তালহা আনসারী রা.-এর কবর বোহায়রা রোমে।
হযরত ফযল ইবনে আব্বাস রা.-এর কবর সিরিয়ায়
হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর কবর হিমসে।
হযরত বিলাল হাবশী রা.-এর কবর দামেশকে।
হযরত আবুদ্দারদা রা.-এর কবর জর্ডানে।
হযরত জাফর ইবনে আবী তালিব রা.-এর কবর মোতায়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রা.-এর কবর জর্ডান নদীর পাশে।
হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা.-এর কবর জর্ডানের এক পাহাড়ে।
হযরত যিরার ইবনুল আযওয়ার রা.-এর কবর জর্ডানের এক পাহাড়ে।
হযরত উবাদা ইবনুছ ছামেত রা.-এর কবর জর্ডানের এক পাহাড়ে।
হযরত আবু যামআহ রা.-এর কবর তিউনিসে।
হযরত কুছাম ইবনে আব্বাস রা.-এর কবর সমরকন্দে।
হযরত আমর ইবনে মাদিকরিব রা.-এর কবর নেহাওয়ান্দে।
৫০ হিজরীতে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবী ছগরা রা. কাবুলের রাস্তা হয়ে পেশাওয়ার এবং পেশাওয়ার থেকে লাহোর হয়ে কেলাত পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। কেলাতের পাহাড়ে আজও সাতজন সাহাবী-তাবেয়ীর কবর আছে।
এ তালিকা থেকে বোঝা যায়, হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানিত সাহাবীগণ দ্বীনের ডাকে আপন ভূমি থেকে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। দাওয়াত ও জিহাদের পথে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
(একটি উর্দু পত্রিকা থেকে সংগৃহিত। সংগ্রহে : আবু তাশরীফ)

Sunday, April 21, 2013

জীবন কীভাবে হয় গোলাবের মত সুন্দর! = মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

এক যুগ আগের লেখা একটি গল্প। জীবনের গল্প জীবনের জন্য। জীবনের গল্প থেকে যারা পেতে চায় জীবনের শিক্ষা,  তাদের জন্য। কামনা করি, শুধু গল্প না হয়ে এটি যেন হতে পারে প্রতিটি জীবনের উদ্যানে একটি ‘রক্তজবা’।)
***
আমার ছোট্ট ছেলে, কতই বা বয়স, আটের একটু নীচে বা নয়ের একটু উপরে। আবার হতে পারে আট ও নয়ের মাঝখানে। দুঃখের বিষয়, ছেলের বয়সের সঠিক হিসাবটা আমার জানা নেই। নিজের বয়সের হিসাবটাই রাখতে পারি না ঠিকমত, অথচ একদিন হিসাব দিতে হবে জীবনের প্রতিটি দিনের, প্রতিটি সময়ের এবং প্রতিটি কর্মের!
ছেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব অন্তরঙ্গ। আমাদের যেমন বড় বড় আনন্দ আছে এবং আছে বড় বড় দুঃখ, ছোটদেরও আছে ছোট ছোট আনন্দ এবং ছোট ছোট দুঃখ। এই যে বলছি ‘ছোট’ সেটা শুধু আমাদের দিক থেকে। ওদের দিক থেকে কিন্তু পাখীর বাসায় ডিম আবিষ্কারের আনন্দ এবং খাঁচার পোষা পাখীটা মরে যাওয়ার দুঃখ বড়দের বড় বড় দুঃখ-আনন্দের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। ছোটদের ছোট ছোট দুঃখ বা আনন্দ বড়রা যদি অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারে তখন ছোটদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বহুদিন আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে। কাছের একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। এমন সময় দেখি, তার ছোট্ট ছেলেটি বাবার কাছে দৌড়ে আসছে। ছোট্ট মুখের উদ্ভাস থেকেই বুঝতে পারলাম, রোমাঞ্চকর কিছু একটা ঘটেছে। ছেলেটি বাবার কাছে এসে বড় বড় চোখ করে বলতে লাগলো, জানো বাবা, আমার বড়শিতে না, এত্তো বড় একটা পুটিমাছ উঠেছে! কোথায় আমাদের জরুরি আলোচনা, আর কোথায় ছোট্ট একটা ‘বড়’ পুটিমাছ! বন্ধুটি বলে দিলেন, যাও তো! বিরক্ত করো না তো! দেখছো না আমরা কথা বলছি!
হায়রে মা‘ছুম বাচ্চা! কোথায় মুখের সেই উদ্ভাস, কোথায় তার অবুঝ মনের রোমাঞ্চ! একেবারে যেন চুপসে গেলো। ফরসা মুখটা যেন ছাইকালো হয়ে গেলো। মাথাটা নীচু করে অপরাধীর মত আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে গেলো।
পরে পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখি, মুখ ভার করে বসে আছে। ছিপটা পাশে পড়ে আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, কোথায় দেখি তোমার বড় পুটিমাছটা! আমি ওর বাবা নই, তবু মুখের উদ্ভাসটা ফিরে এলো, পাত্রের ঢাকনাটা সরিয়ে বললো, এই যে, কত্তো বড়, না! বললাম, তাই তো, অনেক বড় তো! চলো আমরা আরো মাছ ধরি! ছেলেটি সেদিন কী যে খুশী হয়েছিলো! এখন সে যথেষ্ট বড় হয়েছে, আর সেই ‘বড়’ পুটিমাছটার কথা বেমালুম ভুলে গেছে!
আমার ছেলের আনন্দের এবং কষ্টের আমি ভাগ নিতে চেষ্টা করি, তাই আমাদের সম্পর্কটা খুব অন্তরঙ্গ। ও যখন আরো ছোট্টটি ছিলো তখন অবশ্য মায়ের কোলই ছিলো ওর সবচে’ প্রিয়। বাবার কোলে খুব একটা আসতে চাইতো না। হাত বাড়ালে মায়ের কোলে আরো যেন গুটিয়ে যেতো। বাবার কোল কি আর হয় মায়ের কোলের মত!
তাই দূর থেকেই দেখতাম, মায়ের কোলে ওঠে কেমন মিষ্টি করে হাসে, আর মায়ের কোলে ওঠার জন্য কেমন মিষ্টি করে কাঁদে!
আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্বটা শুরু হলো যখন মায়ের কোল থেকে নেমে এলো, আর বাবার হাত ধরে বাড়ীর পিছনে ফুলবাগানে যাওয়া শুরু করল।
***
আমি যখন ছোট্ট ছিলাম, বাড়ীর পিছনের অংশে বড় একটা ফুলের বাগান ছিলো, এখনো আছে। তখন ছেলেটি ছিলো না। আমি ছিলাম, আর আমার আববা ছিলেন। এখন আববা নেই। আমি আছি, আর আছে আমার ছেলেটি। তখনো ছিলো যে দৃশ্য, এখনো আছে সেই একই দৃশ্য। তখনো একটি ছোট্ট ছেলে বাবার হাত ধরে ফুলবাগানে ঘুরে বেড়াতো, গাছের যত্ন নিতো। পাতাগুলো মুছে দিতো, গাছের গোড়ায় পানি দিতো। এখনো একটি ছোট্ট ছেলে বাবার হাত ধরে ফুলবাগানে ঘুরে বেড়ায়। গাছের যত্ন নেয়। পাতাগুলো মুছে দেয় এবং গাছের গোড়ায় পানি দেয়। একই দৃশ্য, কিন্তু সেদিনের সেই শিশুটির বাবা আজ নেই। পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না তাঁকে। তিনি ঘুমিয়ে আছেন এই বাগানেরই এককোণে বকুল গাছের ছায়ায়, মাটির বিছানায়।
সেদিনের সেই শিশুটিও আজ আর শিশু নেই। আজ সে ‘বড়সড়’ এক বাবা। আমার ছোট্ট ছেলেটির বাবা!
এভাবেই চলছে পৃথিবীর শুরু থেকে। আজকের বাবা কোথায় যেন হারিয়ে যায়, আর আজকের শিশু অন্য শিশুর বাবা হয়ে যায়! এভাবেই চলবে পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত। বাবারা চলে যাবে অনন্তযাত্রার মিছিলে, শিশুরা বাবা হবে, আর নতুন শিশুর আগমন ঘটবে পৃথিবীর ‘মিলন-বিচ্ছেদের’ মেলায়। ফুলবাগানে যেমন পুরোনো ফুলগুলো ধীরে ধীরে ঝরে যায়, আর নতুন কলিরা ফুল হয়ে ফোটে বৃক্ষশাখায়।
***
মন বিষণ্ণকরা এসব চিন্তা অকারণে ছিলো না। এই মাত্র ছোট্ট ছেলেটি বুকভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে খবর দিলো, বাড়ীর বাগানে ওর লাগানো গোলাবগাছে গোলাব ফুটেছে! এই বাগানে সেই ছোট্টকালে আমিও একটি গোলাবচারা রোপণ করেছিলাম। ধীরে ধীরে তা বড় হয়েছিলো এবং একদিন তাতে একটি কলি এসেছিলো, কিন্তু ... থাক আমার শৈশবের কষ্টের কথা, তার চেয়ে ছেলেটির আনন্দের কথাই শুধু বলি।
আমার ছোট্ট ছেলেটি এবং তার মত ছোট ছোট যেখানে যত শিশু আছে, তাদের যেমন নিশ্চিন্ত জীবন, খেলাধূলা ও হাসি-আনন্দের জীবন, আমরা যারা বড়, আমাদের জীবন তো আর তাদের মত নয়। আমাদের জীবনে কত ঝড়ঝাপটা, কত আঘাত, সংঘাত! আমাদের জীবনে শুধু অশ্রু ঝরে না, রক্তও ঝরে। যখন আমরা কোন শিশুর সান্নিধ্যে থাকি, তাদের সঙ্গে কথা বলি তখন আমাদের জীবনটাও হয়ে যায় নির্মল আনন্দের। আসলে ওদের হাসি-আনন্দ আমাদেরও স্পর্শ করে। কিন্তু কতক্ষণ আমরা সময় দিতে পারি শিশুদের, কিংবা ওরা আমাদের! আসলে তখনই জীবনটা আমাদের হয়ে পড়ে বড় কষ্টের, বড় নির্দয়তা ও নির্মমতার!
সেদিন বাড়ীর বারান্দায় চেয়ার পেতে একলাটি বসেছিলাম, ছেলেরা মেয়েরা লুকোচুরি খেলছিলো। কে কোন্ বাড়ীর ছেলে বা মেয়ে, সবাইকে চিনিও না, তবু মনে হলো কত যেন আপন! কী নির্মল আনন্দের জীবন! যেন আমারই শৈশব অসংখ্য পাপড়ী মেলে আমার চোখের সামনে! ওদের আনন্দকলরোলে হারিয়ে কখন যেন আমি চলে গিয়েছিলাম নিজের শৈশবজীবনে। কেমন ছোট্টটি ছিলাম! আমারও হাসি-আনন্দ ছিলো! আমারও কান্না ছিলো, বায়না ছিলো, দোলনা ছিলো, খেলনা ছিলো! বাবার হাত ধরে ফুলবাগানে আমিও ঘুরে বেড়াতাম! ...
হঠাৎ চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেলো একটি কচি কণ্ঠের উচ্ছ্বাসে! ‘আববু, দেখে যাও, দেখে যাও, আমার গোলাবগাছের সেই কলিটা না, আজ ফুটেছে! কী সুন্দর গোলাব হয়েছে!’
আমার ছোট্ট ছেলেটি পিছন থেকে এসে গলা জড়িয়ে ধরলো। ওর আনন্দ যেন আর ধরে না! হায়, ও কী করে বোঝবে আমার হৃদয়ে এখন কত রক্তক্ষরণ হচ্ছে! দেশে এখন কত জুলুম অত্যাচার! জীবন এখন কত নিরাপত্তাহীন! প্রতিদিন কত মানুষের রক্ত ঝরে! কত বুক ঝাঁঝরা হয়!
ছেট্ট ছেলের, ছোট্ট মেয়ের আনন্দঝলমল মুখমন্ডল কিছুক্ষণের জন্য হলেও সব কষ্ট- ব্যথা দূর করে দেয়; মনের আকাশের সব মেঘ-ছায়া মুছে দেয়। আমার ছেলেটির আনন্দ-ঝলমল মুখমন্ডল দেখে আমিও যেন সবকিছু ভুলে গেলাম। জীবনের কোথাও যেন হিংসা-বিদ্বেষ নেই, আছে শুধু স্নেহ-মমতা, আর ভালোবাসা! কোথাও  গোলাগুলির আওয়ায নেই, মৃত্যুর আর্তনাদ নেই, আছে শুধু পাখীর গান! জীবন যেন শুধু ফুলবাগিচা, আর কলিদের ফুল হয়ে ফোটা! একটি শিশুর বাগানে গোলাবগাছে একটি কলি ফুল হয়ে ফোটা কত আনন্দের! আবার একটি কলি ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরে যাওয়া কত বেদনার তা আমি বেশ অনুভব করতে পারি। কারণ আমিও একদিন ছোট্ট শিশুটি ছিলাম। আমি ছিলাম, আববা ছিলেন। আমার ছেলেটি ছিলো না, আর ঐ যে বকুলগাছটা, তখন এত বড়টি ছিলো না। আমি যেমন ধীরে ধীরে বড় হলাম এবং আমার শৈশব হারিয়ে গেলো, তেমনি বকুলগাছটাও ধীরে ধীরে বড় হলো, আর তার শৈশব হারিয়ে গেলো। তারপর একদিন আববা হারিয়ে গেলেন।
আমার গোলবগাছের কলিটা যেদিন ফুল না হয়েই ঝরে গিয়েছিলো সেদিন অনেক কষ্ট হয়েছিলো এবং অনেক কান্না পেয়েছিলো। লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম, কেউ দেখেনি, শুধু আববা দেখেছিলেন। আববা সেদিন সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘যারা অনেক বড় হবে তাদের এভাবে কাঁদতে নেই। দেখো, তোমার গোলাবগাছে আবার কলি আসবে, সেই কলি আর ঝরে যাবে না, ফুল হয়ে ফোটবে।’
আববা আরো বলেছিলেন, ‘সেদিন আমিও তোমার সঙ্গে যাবো। আমিও দেখবো তোমার গোলাবগাছের গোলাবফুল। আর দেখবো, কার হাসি বেশী সুন্দর, তোমার মুখের হাসি, না গোলাবফুলের হাসি!’
এভাবে বিভিন্ন কথা বলে আববা আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিলেন।
আববার যেদিন মৃত্যু হলো সেদিন অনেক কেঁদেছিলাম। শুভ্র-সুন্দর কাফনে আববাকে যখন শুইয়ে দেয়া হলো বকুলগাছের নীচে কবরের মাটিতে, আমার অনেক কান্না পেয়েছিলো, কিন্তু সেদিন আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ ছিলো না।
দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকতো, আমি চুপি চুপি বকুলগাছের নীচে আববার কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। আমার খুব কান্না পেতো। বকুলগাছটা মনে হয় আমার কান্না শুনতে পেতো। হয়ত বকুলগাছটারও মন কাঁদতো। একদিন ভোরে গিয়ে দেখি আববার কবর ছেয়ে আছে বকুল ফুলে। সেদিন থেকে আমার কান্না থেমে গেলো। বকুলগাছটি যেন আববার কবরে ফুল বিছিয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিলো। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বকুলগাছটির দিকে তাকালাম। ....
আবার চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেলো।
‘চলো না আববু!’ ছেলেটা হাত ধরে আমাকে চেয়ার থেকে টেনে তুললো। বললাম, ‘চলো যাই তোমার বাগানে তোমার গোলাবফুলের কাছে।’
আবার সেই একই দৃশ্য! একজন বাবার হাত ধরে ফুলবাগানে একটি ছোট্ট শিশুর হেঁটে চলার দৃশ্য! বহুবছর আগে এই বাগানেরই দৃশ্য! তখন আমি ছিলাম, আববা ছিলেন। আববার হাত ধরে ছোট্ট আমি হেঁটে গিয়েছিলাম বাগানের একই জায়গায় নিজের হাতে লাগানো আমার গোলাবগাছের কাছে, একটি ফুটন্ত গোলাবের সৌন্দর্য আববাকে দেখাবো বলে। কিন্তু ...
বাহ, বেশ সুন্দর গোলাবফুলটি তো! সত্যি অবাক হওয়ার মত সুন্দরই ছিলো গোলাবফুলটি। একবার আমি ছোট্ট ছেলেটির চিবুক ধরে আদর করি, একবার হাত বুলিয়ে গোলাবফুলটিকে আদর জানাই। একসময় ছোট্ট ছেলেটির উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখি তো, কার হাসি বেশী সুন্দর, তোমার মুখের হাসি, না গোলাবফুলের হাসি!
কথাটা বলেই চমকে উঠলাম। ঠিক একথাই তো বলেছিলেন একদিন একজন আববা একটি ছোট্ট শিশুকে! আমার আববা আমাকে!!
সেদিন গোলাবের কলিটি পড়ে ছিলো নীচে মাটিতে। সেই ঝরে যাওয়া গোলাব-কলিটির উপর আমার চোখ থেকে ঝরেছিলো দু’ফোটা অশ্রু। কেন ফুটেনি গোলাবের কলিটি?! আমার সঙ্গে কি তার কোন অভিমান ছিলো?! আমি তো অনেক যত্ন করে পানি দিতাম গাছের গোড়ায়, এখন যেমন আমার ছেলেটি রোজ সকালে পানি দেয় তার গোলাবগাছের গোড়ায়!
কল্পনায় চলে গিয়েছিলাম দূর অতীতে আমার শৈশবের সেই দৃশ্যগুলোর কাছে; মাটিতে পড়ে থাকা সেই গোলাব-কলিটির কাছে। ছেলের কথায় ফিরে এলাম বর্তমানে, বড় সুন্দর হয়ে ফুটে থাকা গোলাবফুলটির কাছে। ‘আববু, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়?’
আবার অবাক হলাম, আশ্চর্য! আজকের শিশুটির মাঝে বারবার কীভাবে ফিরে আসছে চল্লিশ বছর আগের সেই শিশুটি!
বকুলগাছের ছায়ায় মাটির বিছানায় যিনি শুয়ে আছেন তাঁর হাত ধরে একদিন একটি ছোট্ট শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছিলো এখানে এই বাগানে; আমি এবং আমার আববা। আমার চিবুক ধরে আদর করে আববা বলেছিলেন, ‘তোমার জীবন যেন হয় গোলাবের মত সুন্দর।’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আববা, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়?
আববা বলেছিলেন, এককাজ করো; এখানে এই মাটিতে একটি গোলাবের চারা রোপণ করো। তারপর প্রতিদিন গাছটির যত্ন নাও; গাছের গোড়ায় পানি দাও। তোমার হাতে লাগানো গোলাবের ছোট্ট চারাটি ধীরে ধীরে বড় হবে। একদিন তাতে কলি আসবে। সেই কলি ফুল হয়ে ফোটবে। তখন তোমাকে বলবো, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়।
আমি গোলাবের চারা রোপণ করেছিলাম। আমার যত্নে ধীরে ধীরে তা বড় হয়েছিলো এবং সত্যি সত্যি একদিন তাতে কলি এসেছিলো। গোলাবগাছের প্রথম কলিটি দেখে কী যে আনন্দ হয়েছিলো! মনে হয়েছিলো, গাছটি আমার খুব ভালো বন্ধু। আমি যে এত দিন গাছটির যত্ন নিয়েছি, গোড়ায় পানি দিয়েছি, তাই আমাকে সে একটি গোলাব ফুল উপহার দেবে।
একটি গোলাব কীভাবে ধীরে ধীরে ফুল হয়ে ফোটে, তা দেখার আমর খুব ইচ্ছে ছিলো। তাই সকাল-সন্ধ্যা কলিটিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করতাম, কিন্তু বুঝতে পারতাম না, কলিটি কীভাবে বড় হচ্ছে। ভাবতাম, কলিরা হয়ত রাতে বড় হয়। কেউ যেন বলেছিলো, যখন রাত হয়, বাগানে অন্ধকার নামে তখন ফুলপরীরা আলোর ডানা মেলে আকাশে তাদের রাজ্য থেকে উড়ে আসে। বাগানে বাগানে ঘুরে বেড়ায়; ফুলকলিদের আদর করে, তাতে ফুলকলিরা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে এবং ফুল হয়ে ফোটে। ফুলপরীরা ফুলকলিকে চুমু খায়, তাতে ফুলপরীদের শরীরের সুবাস ফুলকলিদের গায়ে মেখে যায়।
অবাক হয়ে ভাবতাম, আমাদের বাগানেও কি ফুলপরীরা আসে! আলোর ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়! গোলাব-কলিদের আদর জানায়, চুমু খায়! রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুলপরীদের কি দেখা যায়!
একদিন দেখি, গোলাব-কলির সবুজ আবরণের ফাঁকে একটু লালের আভাস দেখা যায়! আমার তখন কী যে আনন্দ! আববাকে দেখালাম, আম্মাকে দেখালাম। আমার খুশিতে তারাও খুশী হলেন।
দু’দিন পর, সবুজের আবরণ আরো ফাঁক হলো; আরেকটু লাল দেখা গেলো। আমি যেন আর অপেক্ষা করতে পারি না; আর যেন দেরী সয় না। ফুলপরীরা এত ধীরে ধীরে কলিদের ফোটায় কেন?!
তারপর একদিন দেখি, গোলাবের কলিটি মুখ খুলেছে। আববা বললেন, আম্মা বললেন, আগামীকাল ভোরে কলিটি সম্পূর্ণ ফোটবে। আমি অস্থির মনে অপেক্ষা করছি ভোরের জন্য। কখন রাত হবে, কখন রাত ভোর হবে, আর আমার গোলাবগাছের প্রথম কলিটি গোলাব হয়ে ফোটবে! তখন আববা আমাকে বলবেন, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়?!
সেদিন রাতে স্বপ্নে দেখি, আমি একা একা বাগানে গিয়েছি। বাগানে অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। কেমন যেন ভয় ভয় করছে। হঠাৎ দেখি, বাগানে আর অন্ধকার নেই। চারদিকে কী ফকফকে আলো, কেমন মিষ্টি সুবাস! আর দেখি, আলোর ডানা মেলে আকাশ থেকে নেমে আসছে ফুটফুটে সুন্দর এক ফুলপরী! ফুলপরী আমার ঠিক সামনে এসে নামলো। আমাকে দেখে কী সুন্দর করে হাসলো! সে হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে! পরীরা এত সুন্দর! পরীদের ডানায় এতো আলো! গায়ে এত সুবাস!! ফুলপরী আলোর ডানা দুলিয়ে আমাকে আদর জানালো, আর বললো, এসো খোকামণি, তোমার গোলাবগাছের কাছে এসো। দেখো, আলোর ডানা বুলিয়ে কীভাবে কলি থেকে ফুল ফোটাই।
ফুলপরীকে আমার খুব ভালো লাগলো। ফুলপরীর কথা শুনে খুব আনন্দ হলো। গোলাবগাছটির কাছে গেলাম। আমি শুধু দেখছি, ফুলপরী কী করে; কীভাবে কলি থেকে ফুল ফোটায়! যেই না ফুলপরী গোলাব-কলিটির গায়ে আলোর ডানা বুলিয়ে দিলো, অমনি গোলাব-কলিটি একটি বড় লাল গোলাব হয়ে গেলো! আনন্দে আমি চিৎকার করে উঠলাম, কী সুন্দর! কী সুন্দর!
চিৎকার শুনে আম্মা ছুটে এলেন, আববা ছুটে এলেন। তখন বুঝলাম, এ ছিলো সুন্দর এক স্বপ্ন!  আমি বাগানে গিয়েছিলাম, তবে স্বপ্নে! ফুলপরী আমাদের বাগানে এসেছিলো, তবে স্বপ্নে! কিন্তু ফুলপরী যে আলোর ডানা বুলিয়ে গোলাবের কলি থেকে ফুল ফুটিয়েছে, সেও কি শুধু স্বপ্নে?! না, না এটা স্বপ্ন হতে পারে না। নিশ্চয় বাগানে গোলাবগাছে একটি বড় লাল গোলাব ফুটে আছে। গোলাবের পাপড়িতে নিশ্চয় শিশির পড়েছে। গোলাবের পাপড়িতে যখন শিশির পড়ে, দেখতে বড় সুন্দর হয়। আজ আমি জানবো, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়?!
***
ভোর হলো; ফজরের আযান হলো। ভোরে ফজরের আযানের ধ্বনি শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। আজকের ফজরের আযান আরো ভালো লাগলো। প্রতিটি শব্দে যেন গোলাবের সুবাস। ইচ্ছে হলো, এখনই ছুটে যাই বাগানে গোলাবগাছটির কাছে। কিন্তু না, আগে আমি আবার সঙ্গে মসজিদে যাবো। ফজরের নামায পড়বো। তারপর আববার হাত ধরে বাগানে যাবো। আজকের ফোটা লাল গোলাবটির সামনে দাঁড়িয়ে আববা আমাকে বলবেন, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়!
ফজরের নামায হলো। আববার হাত ধরে ধীরে ধীরে মসজিদ থেকে বের হলাম এবং বাড়ীর পিছনে ফুলবাগানে গেলাম। যেখানে আমার এত আদরের, এত যত্নের গোলাবগাছটি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু একি! কোথায় গোলাবের কলি! কোথায় আমার লাল গোলাব!!
আবার হাত ছেড়ে আমি দৌড়ে গেলাম গোলাবগাছটির কাছে। নীচে মাটিতে পড়ে আছে আধফোটা গোলাবের কলিটি! আমার ছোট্ট বুকটা তখন কেমন করে উঠলো। খুব কান্না পেলো। চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো মাটিতে পড়ে থাকা আধফোটা গোলাব-কলিটির উপর।
আববা আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, দেখো, তোমার গোলাবগাছে আবার কলি হবে, সেই কলি অবশ্যই ফুল হয়ে ফোটবে।
আববা অনেক কথা বললেন, শুধু বলা হলো না, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়!
***
আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম দূর অতীতে আমার শৈশবের বেদনাময় স্মৃতির মাঝে। ভুলেই গিয়েছিলাম, আমি এখন সেই ছোট্ট শিশুটি নই। এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি একটি শিশুর হাত ধরে একটি গোলাবগাছের সামনে, যার ডালে ফুটে আছে সুন্দর একটি লাল গোলাব!  যে ফুল সেদিনের সেই শিশুটির গাছে ফুটেনি, আজ তা ফুটেছে আজকের শিশুটির হাতে লাগানো গাছের ডালে।
আবার সেই প্রশ্ন! আজকের বাবার উদ্দেশ্যে আজকের ছোট্ট শিশুটির প্রশ্ন! ‘বলো না আববু, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর হয়!
ছোট্ট ছেলেটিকে আদর করে কাছে টেনে নিলাম, চিবুক ধরে আদর করে বললাম, হাঁ, আজ আমি তোমাকে বলবো, জীবন কীভাবে গোলাবের মত সুন্দর  হয়!
দেখো, তোমার বাগানে গোলাবের কলিটি ধীরে ধীরে বড় হয়েছে এবং আজ পূর্ণ একটি গোলাব হয়ে ফুটেছে। মানবশিশুও পৃথিবীর বাগানে গোলাবের কলি। সেও ধীরে ধীরে বড় হয় এবং একসময় একজন পূর্ণ মানুষ হয়। সবাই কেন ভালোবাসে গোলাবকে? কেননা গোলাব মানুষকে সুবাস দেয়। গোলাবের সুবাসে বাগানের মাটিও সুবাসিত হয়। একজন বড় জ্ঞানী ছিলেন শেখ সা‘দী। জ্ঞানী ছিলেন এবং কবি ছিলেন। তাঁর একটি কবিতা এরকম, ‘বাগানে একটি মাটির ঢেলা হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি তো ফুল নও, তোমার এত সুবাস কেন? মাটির ঢেলা বললো, আমি তুচ্ছ মাটির ঢেলা, কিন্তু ছিলাম গোলাবের সান্নিধ্যে। তাই গোলাবের সুবাস এসেছে আমারও গায়ে।’
তুমি যদি সুন্দর চরিত্র অর্জন করতে পারো তাহলে তোমার সুন্দর চরিত্রের সুবাসে সারা পৃথিবী সুবাসিত হবে এবং মানুষ তোমাকে গোলাবের মত ভালোবাসবে। চরিত্রের সৌন্দর্য দ্বারাই তোমার জীবন হতে পারে গোলাবের মত সুন্দর।

ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ধর্মনিরপেক্ষতা


মানবজীবনে ধর্মের প্রভাব প্রাকৃতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠিত। যত বড় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রই হোক, সেখানে কোন না কোনো পর্যায়ে ধর্মের প্রভাব আপনি অবশ্যই লক্ষ্য করবেন। কারণ, আদি কাল থেকে প্রায় সকল মানুষ ধর্মের বলয়ে বাস করে আসছে। এটা মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাবের অংশ এবং সৃষ্টিগত কারণেই মানুষ স্রষ্টামুখী। সুতরাং তাদের রাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে ধর্মের বলয় ছেড়ে বের হয়ে যাবে এটা হয় না। মানুষের প্রয়োজনে সৃষ্ট একটি কল্যাণরাষ্ট্র এই মনুষ্য প্রকৃতিকে উপেক্ষা করতে পারে না। ধর্ম  নিরপেক্ষতার শাব্দিক অর্থ যাই হোক, যারা এই মতবাদে বিশ্বাস করে, আচরণগতভাবে তারা অন্তহীন স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়।
ধর্মনিরক্ষতাবাদীরা বলে থাকেন, একটি রাষ্ট্রে একাধিক ধর্মাবলম্বী বসবাস করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি ধর্ম অপর ধর্মের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব তথা শান্তি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, উন্নতি সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির পথে ধর্ম প্রধান প্রতিবন্ধক। সুতরাং রাষ্ট্রের সার্বজনীনতা উন্নতি নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিল রক্ষা করতে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে। তারা মনে করে, এটা অপরাপর ধর্মের মতো ইসলামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আসলে তাদের এই বক্তব্য যথার্থ নয়। অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে এই বক্তব্য চললেও ইসলামের ক্ষেত্রে তা মোটেও প্রযোজ্য নয়। ইসলাম ছাড়া কোন ধর্ম  তো পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হওয়ার দাবিই করেনি। ইসলামই শুধু এই দাবি করে এবং তার এই দাবি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত, হাজার বছরের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত। পুরো মানব জাতির শান্তি উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক কর্মধারার সঙ্গে প্রয়োজনীয় মিল রক্ষা করার ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
মোটকথা জীবনের সব কিছু যা ধারণ করে তাই যদি ধর্ম হয়, তবে এই সংজ্ঞায় একমাত্র ইসলামই উত্তীর্ণ। রাষ্ট্র যদি জীবনের অংশ হয় তবে অবশ্যই তা জীবন-ধর্ম ইসলামেরও অংশ। রাষ্ট্র  থেকে ইসলামকে ইসলাম থেকে রাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। বিশ্বজনীন ধর্ম। আল্লাহর তায়ালার মনোনীত, চির উন্নত বিজয়ী ধর্ম। অপরাপর ধর্মের মাঝে এগুলি ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য -বৈশিষ্ট্যগুলো যথাযথ অনুধাবন করতে না পারার কারণে অনেকে ইসলামকে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মের ন্যায় কিছু আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব ধর্ম মনে করে। সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং আইন বিচার ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামকে অকার্যকর মনে করে এবং এই সকল ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনকে সাম্প্রদায়িকতা মনে করে। তাই শুরুতে আমরা ইসলামের কিছু বৈশিষ্টের উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাতের চেষ্টা করব। যাতে ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা সার্বজনীনতা  আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়। অতঃপর ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করব।
. ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। আকীদা, ইবাদত, সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং শিক্ষাসহ মানব জীবনের সবকিছু এই ধর্মের ব্যাপকতার আওতাভুক্ত। ইসলাম ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন করীমে ইরশাদ হয়েছে
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করলাম। এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে ইসলামকে (চিরকালের জন্য) পছন্দ করে নিলাম। (সূরা মায়েদা : )
আরো ইরশাদ হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ
হে মুমিনগণ ইসলামে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চিত  জেন, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (বাকারা : ২০৮)
সুতরাং কুরআন-সুন্নায় মানব জীবনের সকল বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং বিধিবিধান রয়েছে।  ফেকাহ শাস্ত্রে খুটিনাটি সব কিছুর বিস্তারিত আলোচনা আছে। এর কিছু মান্য করা, কিছুকে অস্বীকার করা কুফরী। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে :
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ. البقرة
তবে  তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ এবং কিছু অংশ অস্বীকার কর? তাহলে বল, যারা এরূপ করে তাদের শাস্তি এছাড়া আর কী হতে পারে যেপার্থিব জীবনে তাদের জন্য থাকবে লাঞ্ছনা। আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠিনতর আযাবের দিকে? তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন।  (বাকারা : ৮৫)
ইসলাম-পূর্ব আসমানী ধর্মগুলো সারা পৃথিবীর জন্য এবং সব যুগের জন্য ছিলো না। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলোতে জীবনের সকল বিষয়ের সমাধান নেই এবং সেগুলো পূর্ণাঙ্গ নয়। কিন্তু ইসলাম এর ব্যতিক্রম।
. ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ দ্বীন। মানুষের ইহকালীন পরকালীন মুক্তি একমাত্র ধর্মের মাঝে নিহিত।  এরশাদ হয়েছে :
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلامُ
নিশ্চয় আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন কেবল ইসলাম। (আলে ইমরান : ১৯)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনও দ্বীন অবলম্বন করতে চাবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে যারা মহা ক্ষতিগ্রস্ত, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (আলে ইমরান : ৮৫)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে :
عن جابر عن النبى صلى الله عليه و سلم قال وفيه، ولو كان موسى حيا ما وسعه الا اتباعى ، رواه احمد فى مسنده جـ٤ رقم ١٤٧٣٦ و البيهقى فى شعب الايمان جـ١ باب في الإيمان بالقرآن و سائر الكتب المنـزله رقم ١٧٦
যদি মুসা . জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হত। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস, ১৪৭৩৬ শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১৭৬)
. ইসলাম বিশ্বজনীন ধর্ম, সকল মানুষের ধর্ম
আল্লাহ পাক বলেন :
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ
রমযান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, বিশ্বমানবের জন্য যা আদ্যোপান্ত হেদায়াত এবং এমন সুষ্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য মিথ্যার মধ্যে চুড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। (বাকার : ১৮৫)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
 (হে রাসূল! তাদেরকেবল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি সেই আল্লহর প্রেরিত রাসূল, যার আয়ত্তে আসমানসমূহ পৃথিবীর রাজত্ব। (আরাফ : ১৫৮)
আরো ইরশাদ হয়েছে:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
হে নবী! আমি তোমাকে জগতসমূহের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি। (আম্বিয়া : ১০৭)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
হে মানুষ! তোমাদের কাছে এমন জিনিস এসেছে যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক উপদেশ, অন্তরের রোগ-ব্যাধির উপশম এবং মুমিনের পক্ষে হেদায়াত রহমত। (ইউনুস : ৫৭)
ইসলাম মানবধর্ম। জাতি-ধর্ম বংশ-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি ন্যায় বিচার, সহমর্মিতা, সৌজন্যমূলক আচরণ, জীবের প্রতি দয়া এই ধর্মের অন্যতম শিক্ষা। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে :
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
হে মুসলিমগণ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারকে আদায় করে দিবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ইনসাফের সাথে বিচার করবে। নিশ্চিত জেন, আল্লাহ তোমাদেরকে যে বিষয়ে উপদেশ দেন তা অতি উৎকৃষ্ট হয়ে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন। (নিসা : ৫৮)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا
নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি  সত্য সম্বলিত কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে উপলব্ধি দিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে মীমাংসা করতে পার। আর তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষ অবলম্বন করো না। (নিসা. ১০৫)
 অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
হে মুমিনগণ! তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী হয়ে যাও। আল্লাহর স্বাক্ষীরূপে-যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে কিংবা পিতা-মাতা আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে ব্যক্তি (যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার আদেশ করা হচ্ছে) যদি ধনী বা গরীব হয় তবে আল্লাহ উভয় প্রকার লোকের ব্যাপারে তোমার চেয়ে বেশী কল্যাণকামী। সুতরাং এমন খেয়ালখুশির অনুসরণ করবে  না, যা তোমাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়। তোমরা যদি পেঁচাও  অর্থাৎ (মিথ্যা সাক্ষ্য দাও) অথবা (সঠিক সাক্ষ্য দেওয়া থেকে) পাশ কাটিয়ে যাও। তবে জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। (নিসা : ১৩৫)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآَنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ! তোমরা এমন হয়ে যাও যে, সর্বদা আল্লাহর (আদেশসমূহ পালনের) জন্য প্রস্ত্তত থাকবে এবং ইনসাফের সাথে সাক্ষদানকারী হবে এবং কোন  সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। ইনসাফ অবলম্বন করো। পন্থাই তাকওয়ার বেশী নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ রূপে অবগত। (মায়েদা : )
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে :
عن  جرير بن عبد الله قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : من لا يرحم الناس لا يرحمه الله. اخرجه مسلم فى صحيحه،  كتاب الفضائل، باب رحمته صلى الله عليه و سلم الصبيان
হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যারা মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন না। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযাইল, হাদীস ৬১৭২)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
عن عبد الله بن عمرو قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : الراحمون  يرحمهم الرحمن، ارحموا من فى الارض يرحمكم من فى السماء. رواه الترمذى فى جامعه، ابواب البر و الصلة، باب ما جاء رحمة الناس  
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, (জীবের প্রতি) দয়াকারীর উপর দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। জমিনে বসবাসকারী মাখলুকের প্রতি দয়া কর, আসমানওয়ালা তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯২৪)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত :
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : الخلق عيال الله، فأحب الخلق إلى الله من أحسن إلى عياله . رواه البيهقى فى شعب الايمان جـ 6  باب طاعة أولى الأمر فصل نصيحة الولاة
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। আল্লাহর কাছে প্রিয় সেই যে তাঁর পরিবারের প্রতি দয়া করে। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস : ৭৪৪৮)
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র সত্য ধর্ম এই ধর্ম সকলকে দরদের সাথে সত্যের পথে আহবান করে। ইহকালীন পরকালীন নাজাতের পথে ডাকে। কিন্তু কাউকে বাধ্য করে না। সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকার করে।
ইরশাদ হয়েছে :
 لا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى  لا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
দ্বীন গ্রহণের বিষয়ে কোন জবরদস্তি নেই। হেদায়েতের পথ গুমরাহি থেকে পৃথক  রূপে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এর পর যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো সে এক মজবুত হাতল আকড়ে ধরল, যা ভেঙ্গে যাওয়ার কোন আশংকা নেই। আল্লাহ সব কিছু শুনেন সবকিছু জানেন। (সূরা বাকারা : ২৫৬)
ইসলাম গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। তবে যিনি  স্বেচ্ছায় সত্যধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তিনি আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকাম পালনে বাধ্য থাকবেন। ক্ষমতানুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে বাধ্যও করবে। বনী ইসরাইল হযরত মুসা আলাইহিস সালামের প্রতি ঈমান আনার পর যখন তাওরাতের হুকুম আহকাম পালনে বাহানা করে, তখন তাদের উপর পাহাড় তুলে ধরা হয়। ইরশাদ হয়েছে :
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آَتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
এবং সেই সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন আমি তোমাদের থেকে (তাওরাতের অনুসরণ সম্পর্কে) প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম এবং তূর পাহাড়কে তোমাদের উপর উত্তোলন করে ধরেছিলাম। (আরও বলেছিলাম যে) আমি তোমাদেরকে যা (যে কিতাব) দিয়েছি তা শক্ত করে ধর এবং তাতে যা কিছু  লেখা আছে তা স্মরণ রাখ, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (বাকারা : ১৩)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে :
عن أبى سعيد قال سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول : من رأى منكم منكرا فليغير بيده، فان لم يستطع فبلسانه، فإن لم يستطع فبقلبه، و ذلك أضعف الإيمان . أخرجه مسلم في صحيحه كتاب الإيمان باب بيان كون  النهي عن المنكر من الإيمان 
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনও গোনাহের কাজ দেখবে শক্তি থাকলে হাত দ্বারা (বল প্রয়োগ করে) তা বন্ধ করে দিবে। শক্তি না থাকলে মুখ দ্বারা বন্ধ করার চেষ্টা করবে।   শক্তিও না থাকলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৭৮)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
عن عبد الله عمرو بن العاص قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : مروا أولادكم بالصلوة و هم أبناء سبع سنين، واضربوا هم عليها وهم أبناء عشر، و فرقوا بينهم فى المضاجع. أخرجه أبو داود  فى سننه، كتاب الصلوة، باب متى يومر الغلام بالصلوة
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শিশুর বয়স যখন সাত বছর হয় তাদেরকে নামাযের আদেশ কর, দশ বছর হলে (প্রয়োজনে) প্রহার (হালকা শাসন) কর এবং তাদের শোয়ার বিছানা পৃথক করে দাও। (সুনানে আবু দাউদ ৪৯৬)
মুরতাদ সম্পর্কে ইসলামী আদালতকে রাসূল সা. নির্দেশ দিয়ে বলেছেন :
عن ابن عباس مرفوعا، من بدل دينه فاقتلوه. أخرجه البخارى فى صحيحه، كتاب استتابة المعاندين و المرتدين، باب حكم المرتد و المرتدة
হযরত ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে মুসলমান দ্বীন ত্যাগ করল তাকে মৃত্যুদন্ড দাও। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬৭২২)
ইসলাম কোনও অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে না। তবে একমাত্র বিজয়ী ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে চায়।
বিজয়ী ধর্ম ইসলাম
ইসলাম আল্লাহ-মনোনীত সত্য ধর্ম। সেহেতু বিজয়ী ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা তার একান্ত কাম্য। সত্যের হাতে পৃথিবীর নেতৃত্ব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং অন্যায় অবিচার দূর করা, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, শান্তি স্থাপন এবং খোদাদ্রোহী কুফরী শক্তির দাপট চূর্ণ করে একমাত্র সত্যধর্ম ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জিহাদের লক্ষ্য।
কুফরী শক্তির দাপট ইসলাম বিরোধী মানবরচিত আইনের কর্তৃত্ব যাবতীয় অশান্তির মূল। হক গ্রহণের  পথে বড় বাধা। সাধারণত মানুষ বিজয়ী শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিজয়ী শক্তির সামনে নতজানু থাকে। চেতনায়-অবচেতনে তাদের অন্ধ অনুসরণ করে চলে। এবং এটাকে গর্বের বিষয় মনে করে। আজকে বিশ্বব্যাপী ইহুদী-নাসারাদের দাপটের প্রেক্ষাপটে মুসলিম জাতির প্রতি চোখ বুলালেই তো বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। এমতাবস্থায় হকের দাওয়াত  যথাযথ কার্যকর হয় না। হককে বোঝা মানা অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই জিহাদের মাধ্যমে কুফরী শক্তিকে পদানত করে ইসলামকে বিজয়ী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
قاتلوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلا بِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَلا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ
কিতাবীদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না এবং পরকালেও না এবং আল্লাহ তাঁর রাসূল যা কিছু হারাম করেছেন তাকে হারাম মনে করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজের দ্বীন বলে স্বীকার করে না তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। যাবৎ না তারা অধীন হয়ে জিযিয়া আদায় করে। (সূরা তাওবা ২৯)
অর্থাৎ তারা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনতা মেনে নেওয়ার পর ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে।
আরো ইরশাদ হয়েছে :
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
আল্লাহ তো হিদায়াত সত্য দ্বীনসহ নিজ রাসূলকে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সব দ্বীনের উপর তাকে জয়যুক্ত করেন। মুশরিকগণ এটাকে যতই অপ্রীতিকর মনে করুক। (তাওবা : ৩৩)
হাদীস শরীফে জিহাদের পরিচয় লক্ষ্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন
من قاتل لتكون كلمة الله هى العليا فهو فى سبيل الله.  أخرجه البخارى فى صحيحه، كتاب العلم، باب من سأل و هو قائم عالما جالسا
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি যুদ্ধ করল লক্ষ্যে, যাতে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হয় সেই আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করল। (সহীহ বুখারী হাদীস , ১২৩)
আরো ইরশাদ হয়েছে :
الإسلام يعلو لا يعلى. أخرجه البخارى تعليقا فى صحيحه كتاب الجنائز- باب إذا أسلم الصبى فمات، هل يصلى عليه الخ و أخرجه البيهقى فى السنن الكبرى موصولا و مرفوعا بسند حسن جـ٦، ص ٢٠٥ باب من صار مسلما بإسلام أبويه أو أحدها
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলাম বিজয়ী দ্বীন পরাজিত নয়। (সহীহ বুখারী হাদীস : ১৩৫৩; সুনানে কুবরা, বায়হাকী /২০৫
 হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রাহ.) তাঁর এক মকতুব  (চিঠিতে)- লিখেছেন :
از آنجاكہ دعوت لسان بدون انضمام جہاد سيف وسنان كامل وتام نمى گردد، لہذا امام ہاديان ورئيس داعيان يعنى سيد ولد عدنان عليہ الصلاة والسلام آخر كار بقتال كفار مامور گرديدند وظہور شعائر دين متين وعلو اعلام شرح متين از اقامت ايں ركن ركين صورت بست۔
অর্থাৎ যেহেতু মৌখিক দাওয়াত অস্ত্রের জিহাদ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে না, তাই সকল দায়ীর ইমাম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ পর্যায়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হয়েছেন। শাআয়েরে দ্বীনের মর্যাদা, শরীআতের বিজয় উন্নতি জিহাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (সীরাতে সায়্যেদ আহমদ শহীদ।
অতএব শান্তি স্থাপন এবং ন্যায় সত্যকে বিজয়ী রাখার লক্ষ্যে সামর্থ অনুযায়ী জিহাদের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা মুসলমানদের উপর ফরয। যা পালন করা প্রথমত মুসলিম শাসক প্রশাসনের কাজ।
ধর্মনিরপেক্ষতা
ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থ যদি কেউ করেন ধর্মের ব্যাপারে ব্যক্তি স্বাধীনতাকাউকে কোনো ধর্মমত গ্রহণে বাধ্য না করা, তাহলে অর্থের সাথে ইসলামের কোনো সংঘাত নেই। কারণ ইসলাম জোরপূর্বক কাউকে ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে না। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম পালন করার অধিকার রয়েছে। ইসলাম জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায় বিচার সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে। এখানে অন্যায় পক্ষপাতিত্বের কোন স্থান নেই।
পরিভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ, সমাজ, রাষ্ট্র, আইন বিচার এবং শিক্ষাকে ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখেন। তাদের শ্লোগান হলো, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার।  অর্থাৎ সামাজিক, রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ধর্মকে নির্বাসিত করাই তাদের লক্ষ্য। ধর্মের কর্তৃত্ব ধর্মীয় আইনকে অস্বীকার করাই ধর্মনিরপেক্ষতা। অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কুফরী মতবাদ। কারণ ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ধর্ম। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি শিক্ষা সবই ইসলামের ব্যাপকতার আওতাভুক্ত। ইসলাম মানব জীবনের সব ক্ষেত্রে এবং সব কিছুর জন্য আদর্শ এমন কিছু নেই যার আদর্শ ইসলামে অনুপস্থিত। এবং একজন মুসলমান স্ব স্ব ক্ষেত্রে সে সকল আদর্শ অনুসরণে বাধ্য এবং সেগুলিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আদিষ্ট।
অন্যান্য ধর্মে সামাজিক , রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য তেমন কোন বিধি বিধান নেই। তাই তারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে। কিন্তু ইসলাম মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য শাশ্বত আদর্শ দান করেছে এবং তা স্বয়ং সর্বজ্ঞ সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত, মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ। তাই ইসলামে ধর্মনিরপেক্ষতার কোন অবকাশ নেই। কোন মুসলমান আদর্শ হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করতে পারে না। এখানে বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী .-এর কয়েকটি বাণী প্রণিধান যোগ্য। তিনি লেখেন,
اسلام نے كسى صورت ميں بهى غلامى پر قناعت نہيں كى بہت سے نصوص سے دلالة اور صراحة ثابت ہوتاہے كہ اسلام كا تقاضا حكومت اور سربلندى ہے قرآن ميں فرمايا گيا ہو
الذي ارسل رسوله الخ
جناب رسول اللہ صلى اللہ عليہ وسلم كا ارشاد ہے  الإسلام يعلو ولا يعلى.
অর্থাৎ ইসলাম কোন অবস্থায় অধীন হয়ে থাকাকে পছন্দ করেনি। কুরআন হাদীসের বহু দলিল থেকে সুষ্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে, হুকুমত বিজয় ইসলামের একান্ত কাম্য। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে, (অর্থ) আল্লাহই তো হিদায়াত সত্য দ্বীনসহ নিজ রাসূলকে প্রেরণ করেছেন যাতে তিনি সব দ্বীনের উপর তাকে জয়যুক্ত করেন। (মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম :/১০৯)
যে সব অমুসলিম দেশে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেওয়া হয় সেসব দেশের মুসলমানদের করণীয় কী? সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন এবং হযরত মাদানী রাহ.-এর উত্তর এই,
سوال : كيا مسلمانوں كو غير اسلامى آئين پر قانع ہو جانا درست ہے؟
মুসলমানদের জন্য অনৈসলামিক আইনের উপর সন্তুষ্ট থাকা জায়েয কি?
بلا شبہ اسلامى قوانين ہى دنيا كے لئے امن وسلامتى كے ضامن ہيں مشتركہ حكومت ميں ان قوانين كى حاكميت مطلقہ قائم نہ ہوگى نہ حدود شرعيہ جارى ہوں گى ليكن يہ خود مسلمانوں كا علمى وعملى فريضہ ہے كہ وہ دوسرى قوموں سے اسلامى قوانين كى يہ حيثيت تسليم كراليں اهون البليتين آخرى منزل مقصود نہيں ہو سكتى.
অর্থাৎ নি:সন্দেহে ইসলামী আইনই বিশ্বশান্তি নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি। সেক্যুলার রাষ্ট্রে আইনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা শাসন কায়েম হবে না। এবং শরীআতের হুদুদ দন্ডবিধি জারি হবে না। তবে এটা স্বয়ং মুসলমানদের দায়িত্ব যে, তারা তাত্ত্বিক আলোচনা এবং নিজেদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরবে। যাতে অন্যান্য জাতি তা মেনে নিতে বাধ্য হয়। আর اهون البليتين  দুই বিপদের মাঝে ছোট বিপদ মেনে নেওয়ার নীতি (অর্থাৎ বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে শান্ত হওয়ার নীতি) আখেরী মানজিল বা চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না।
(মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম : /১১২ )
হযরত মাদানী রাহ. এখানে দুই বিপদ বলেরামরাজ্য  প্রতিষ্ঠা করাকে বড় বিপদ বলেছেন। আর রাষ্ট্রের নীতি ধর্মনিরপেক্ষ হওয়াকে মুসলমানদের জন্য তুলনামূলক ছোট বিপদ বলেছেন। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম অনুসরণের সুযোগ থাকে। এটা স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু হিন্দুদের ধর্মরাজ্যে সুযোগটুকু স্বীকৃত হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাছাড়া রষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিরক মূর্তি পূঁজার আধিপত্যের চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা কিছুটা সহনীয়।
তাই রামরাজ্যের চে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতি সে দেশে মুসলমানদের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। যদিও এর কোনোটিই দ্বীন নয়; বরং তাগুতী নেযাম।
আর ‘‘ এটা আখেরী মানজিল হতে পারে না’’ বলে মুসলমানদের শক্তি সঞ্চয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এবং তিনি একথা বলেছেন অমুসলিম দেশের প্রেক্ষিতে। কোনও মুসলিম দেশে যদি এমন পরিস্থিতি হয় সেখানে সামর্থ অনুযায়ী নাহি আনিল মুনকার ’’ বা অসৎ কাজ, চিন্তা দর্শন প্রতিহত করা মুসলমানদের দায়িত্ব।
অতএব ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করার অর্থ হবে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা , ইসলামের আইন বিচার ব্যাবস্থা এবং ইসলামী জিহাদসহ দ্বীনের বিরাট অংশকে অস্বীকার করা, যা কোন মুমিন মেনে নিতে পারে না।